০১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

​ভক্তির ফুলে তাদের বেঁচে থাকার লড়াই

আপলোড সময় : ০৭-০৬-২০২৬
​ভক্তির ফুলে তাদের বেঁচে থাকার লড়াই ফুটপাতজুড়ে ভোর থেকেই বসে ছোট্ট এক ফুলের হাট

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি : ময়মনসিংহ নগরের কে বি ইসমাইল রোডে পৌর কাঁচাবাজারের সামনের ফুটপাতজুড়ে ভোর থেকেই বসে ছোট্ট এক ফুলের হাট। কাগজ, কুলা আর ডালায় সাজানো জবা, গাঁদা, বেলি ও বেলপাতা দেখে মনে হতে পারে এগুলো শুধু পূজার উপকরণ। কিন্তু এই ফুলের আড়ালে লুকিয়ে আছে কয়েকটি পরিবারের বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও জীবিকার গল্প।

রোববার (৭ জুন) সকাল ৮টায় পৌর কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন নারী-পুরুষ ফুটপাতে বসে ফুল বিক্রি করছেন। তাদের জীবনের গল্প আলাদা হলেও সংগ্রামের জায়গা প্রায় একই।

পুলিশ লাইন এলাকার ৭০ বছর বয়সী ফুলবাসী প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে এখানে ফুল বিক্রি করছেন। প্রতিদিন ভোরে নিজ গাছের ফুল ও বাজার থেকে কেনা ফুল নিয়ে তিনি বসেন ফুটপাতে। পূজার সময় ক্রেতারাই তার প্রধান ভরসা।

তিনি বলেন, চাহিদা ভালো থাকলে দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয়। বয়স হলেও অন্যের ওপর বোঝা না হয়ে নিজের খরচ নিজেই চালাতে চান তিনি।

দক্ষিণ চরকালীবাড়ি এলাকার আরতি রানী বর্মণ (৬৫) স্বামী হারিয়েছেন ১৬ বছর আগে। ছেলেমেয়েরা আলাদা থাকায় দীর্ঘদিন ধরে একাই জীবন সংগ্রাম করছেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই বাজারে ফুল বিক্রি করছেন।

তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল ৬টায় এসে বসেন, সকাল ৯টার মধ্যে বিক্রি শেষ করে বাড়ি ফেরেন। রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত তার প্রায় ২৫০ টাকার ফুল ও পূজার সামগ্রী বিক্রি হয়। বেলপাতা, তুলসীপাতা ও দূর্বাঘাস তিনি নিজে সংগ্রহ করেন, পাশাপাশি নিজের বাড়িতেও ফুলের গাছ লাগিয়েছেন।

একই বাজারে ফুল বিক্রি করেন চর ঈশ্বরদিয়ার মমতা রানী (৪৫)। প্রায় সাত-আট বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত তিনি। সংসারের অতিরিক্ত আয়ের জন্য শুরু করলেও এখন এটি তার জীবিকার অন্যতম ভরসা।

তিনি বলেন, বিক্রির ফুলের একটি অংশ নিজের বাগান থেকে আসে, বাকিটা কিনে আনতে হয়। আয় কম হলেও পূজার মৌসুমে বিক্রি কিছুটা ভালো হয়। মাসে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকার ওষুধ লাগে বলেও জানান তিনি।

এই হাটে ফুল বিক্রি করেন বুশতি বেগম (৬৫) নামের এক নারী, যিনি ব্যতিক্রম হিসেবে পরিচিত। ধর্মীয় পরিচয়ে ভিন্ন হলেও তিনি প্রায় ১৬ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের দেখাশোনা করার মতো কেউ না থাকায় ফুল বিক্রিই তার একমাত্র ভরসা।

তিনি বলেন, “আমার কেউ নাই। এই ফুল বিক্রি করেই খাই, যা আয় হয় তাই দিয়েই চলি।”

সংকর বিন (৪২) দীর্ঘদিন ধরে ফুল বিক্রির পাশাপাশি গরু পালন ও দুধ বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। পরিবারে স্ত্রী ও তিন সন্তান রয়েছে। সংসারের প্রধান দায়িত্ব তার কাঁধেই।

তিনি বলেন, ডাল-ভাত জোগাড় করতে পারলেই তার শান্তি। ফুল ও দুধ বিক্রির আয় দিয়েই কোনোভাবে সংসার চলে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ বিক্রেতাই ভোরে ফুল সংগ্রহ করে বাজারে বসেন। নিজের বাগানের পাশাপাশি বাজার থেকেও ফুল কিনে আনতে হয় অনেককে। সকাল থেকেই চলে বিক্রির অপেক্ষা।

তাদের আয়ের বড় অংশ নির্ভর করে পূজা-পার্বণ ও ধর্মীয় উৎসবের ওপর। দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা ও অন্যান্য উৎসবে বিক্রি বাড়লেও সাধারণ দিনে আয় কম থাকে। অবিক্রীত ফুল নষ্ট হয়ে গেলে অনেক সময় লোকসানও গুনতে হয়।

ক্রেতা টুম্পা বর্মন বলেন, শহরে পূজার উপকরণ সহজে পাওয়া যায় না। এই হাটই তাদের প্রধান ভরসা।

আরেক ক্রেতা শান্ত পাল জানান, নিয়মিতভাবে তিনি এখান থেকে পূজার ফুল ও বেলপাতা কেনেন।

ময়মনসিংহ নগরের এই ছোট্ট ফুলের বাজার শহরের অনেকের কাছে সাধারণ দৃশ্য হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সংগ্রাম, আত্মসম্মান আর বেঁচে থাকার গল্প। ভক্তির প্রতীক এই ফুলই আবার হয়ে উঠেছে কয়েকটি পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন।

সকালের ব্যস্ততা বাড়তেই ক্রেতাদের ভিড় বাড়ে, আর বিক্রেতাদের চোখে ভেসে ওঠে নতুন দিনের আশার আলো। সেই আশাতেই প্রতিদিন ভোরে ফুটপাতে ফুল হাতে বসে পড়েন তারা।


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ